পবিত্র কুরআন এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়কর মিলনস্থল হলো মানুষের হৃদপিণ্ড (Heart) এবং মস্তিষ্কের (Brain) মধ্যকার নিউরোলজিক্যাল সংযোগ। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে যখন মানুষ ভাবত হৃদপিণ্ড কেবল একটি রক্ত পাম্প করার যন্ত্র, তখন পবিত্র কুরআন ঘোষণা করেছিল যে হৃদপিণ্ডের নিজস্ব চিন্তা, উপলব্ধি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে চিকিৎসা বিজ্ঞান ‘নিউরোকার্ডিওলোজি’ (Neurocardiology) নামক একটি নতুন শাখা আবিষ্কার করে কুরআনের সেই দাবিকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করেছে। নিচে কুরআন এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এই নিউরোলজিক্যাল সংযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি: হৃদপিণ্ড কেবল পাম্প নয়, চিন্তার কেন্দ্র
পবিত্র কুরআনে ‘কাল্ব’ (Qalb) বা হৃদপিণ্ড শব্দটিকে শুধু একটি মাংসপিণ্ড হিসেবে নয়, বরং মানুষের অনুধাবন, বুদ্ধি এবং চিন্তাভাবনার মূল কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
-
- সূরা আল-হাজ্ব (আয়াত ৪৬):
“তবে কি তারা দেশ ভ্রমণ করেনি, যাতে তাদের হৃদয় (হৃদপিণ্ড) অনুধাবন করতে পারত এবং কান শুনতে পারত? বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় বক্ষস্থিত হৃদয়।”
- সূরা আল-আরাফ (আয়াত ১৭৯):
“তাদের হৃদয় রয়েছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না…”
- সূরা আল-হাজ্ব (আয়াত ৪৬):
এই আয়াতগুলো পরিষ্কার নির্দেশ করে যে, মানুষের বক্ষস্থিত হৃদপিণ্ডের এমন এক ধরণের যোগ্যতা রয়েছে যা দিয়ে সে তথ্য প্রসেস বা অনুধাবন করতে পারে।
২. আধুনিক নিউরোকার্ডিওলোজি ও “ছোট মস্তিষ্ক” (The Little Brain in the Heart)
১৯৯১ সালে ড. জে. অ্যান্ড্রু আর্মোর (Dr. J. Andrew Armour) নামক একজন নিউরোলজিস্ট প্রথম আবিষ্কার করেন যে, হৃদপিণ্ডের ভেতরে একটি অত্যন্ত জটিল এবং স্বাধীন স্নায়ুতন্ত্র রয়েছে [1].। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় “ইন্ট্রিনসিক কার্ডিয়াক নার্ভাস সিস্টেম” (Intrinsic Cardiac Nervous System) বা সংক্ষেপে “হার্ট ব্রেইন” (Heart Brain) [1].।
-
- ৪০,০০০ নিউরন: মানুষের হৃদপিণ্ডে প্রায় ৪০,০০০ এরও বেশি বিশেষায়িত নিউরন বা স্নায়ুকোষ রয়েছে, যা হুবহু মস্তিষ্কের নিউরনের মতো [1].।
- স্বাধীন সিদ্ধান্ত: এই নিউরনগুলোর কারণে হৃদপিণ্ড মস্তিষ্ক থেকে কোনো নির্দেশ ছাড়াই নিজে নিজে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, অনুভব করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং তা মনেও রাখতে পারে (Short term memory) .।
৩. হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের নিউরোলজিক্যাল কথোপকথন (Heart-Brain Communication)
মেডিকেল সায়েন্স প্রমাণ করেছে যে, হৃদপিণ্ড এবং মস্তিষ্কের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ চলে, তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো—মস্তিষ্ক হৃদপিণ্ডকে যত না সংকেত পাঠায়, তার চেয়ে অনেক বেশি সংকেত হৃদপিণ্ড মস্তিষ্ককে পাঠায়।
এই যোগাযোগ প্রধানত ৪টি উপায়ে হয়:
ক) নিউরোলজিক্যাল সংযোগ (স্নায়ুর মাধ্যমে)
হৃদপিণ্ড থেকে ‘ভেগাস নার্ভ’ (Vagus Nerve)-এর মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম, অ্যামিগডালা এবং থ্যালামাসে সংকেত যায়। অ্যামিগডালা মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। হৃদপিণ্ড যখন কোনো কারণে উত্তেজিত বা শান্ত হয়, সে ভেগাস নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশকে নির্দেশ দেয় কীভাবে প্রতিক্রিয়া করতে হবে।
খ) বায়োফিজিক্যাল সংযোগ (পালস ওয়েভ)
হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দনের সাথে সাথে শরীরে একটি শক্তিশালী রক্তপ্রবাহের তরঙ্গ বা ‘পালস ওয়েভ’ (Pulse Wave) তৈরি হয়। এই তরঙ্গটি সরাসরি মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ এবং আলফা-বিটা তরঙ্গকে মডুলেট বা পরিবর্তন করতে পারে।
g) হরমোনাল সংযোগ (Biochemical)
হৃদপিণ্ড কেবল রক্ত পাম্প করে না, এটি নিজেই একটি এন্ডোক্রাইন বা হরমোন গ্রন্থি। হৃদপিণ্ড থেকে ANF (Atrial Natriuretic Factor) নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা সরাসরি মস্তিষ্কে গিয়ে মানুষের স্ট্রেস হরমোন কমায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
ঘ) ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড (তড়িৎ-চৌম্বকীয় ক্ষেত্র)
হৃদপিণ্ডের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড মস্তিষ্কের চেয়ে প্রায় ৫,০০০ গুণ বেশি শক্তিশালী এবং এটি শরীর থেকে কয়েক ফুট দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। হৃদপিণ্ডের এই শক্তিশালী তরঙ্গ মস্তিষ্কের ইলেকট্রনিক সিগন্যালকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
৪. কুরআন ও বিজ্ঞানের নিখুঁত সামঞ্জস্য
কুরআনে বলা হয়েছে, মানুষের অনৈতিক কাজ বা পাপের কারণে তার হৃদপিণ্ডে ‘মরিচা’ বা ‘পর্দা’ পড়ে যায়, যার ফলে সে আর সত্য অনুধাবন করতে পারে না (সূরা মুতাফফিফিন: ১৪)।
আমেরিকার বিখ্যাত হার্টম্যাথ ইনস্টিটিউট (HeartMath Institute) তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে যে, মানুষ যখন রাগ, ঘৃণা, হিংসা বা নেতিবাচক আবেগে ভোগে, তখন হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের ছন্দ (Heart Rate Variability – HRV) অত্যন্ত বিশৃঙ্খল (Incoherent) হয়ে পড়ে। এই বিশৃঙ্খল সিগন্যাল যখন ভেগাস নার্ভ হয়ে মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সে’ পৌঁছায়, তখন মস্তিষ্কের উচ্চতর চিন্তা করার এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সাময়িকভাবে ব্লক বা অবরুদ্ধ হয়ে যায়। একেই বিজ্ঞানীরা বলছেন “কগনিটিভ ইনহিবিশন” (Cognitive Inhibition), যা কুরআনে বর্ণিত “হৃদয় অন্ধ বা অবরুদ্ধ হওয়া”র বৈজ্ঞানিক রূপ।
বিপরীতভাবে, মানুষ যখন নামাজ, যিকির বা কৃতজ্ঞতাবোধের (Positive Emotions) মধ্যে থাকে, তখন হৃদপিণ্ডের ছন্দ চমৎকার সুসংহত (Coherent) রূপ নেয়, যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা এবং মানসিক শান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আজকের আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করছে যে, মানুষের আসল ‘আমি’ বা চেতনার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে তার হৃদপিণ্ড, যা পবিত্র কুরআন ১৪০০ বছর আগেই মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়েছিল।
Leave a Reply