আমাদের এই একই স্থানে বা মহাবিশ্বে জায়গা একই হলেও একাধিক ডাইমেনশন বা মাত্রা অবস্থান করছে । আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এক একটি নূরের পর্দা বা ‘বারজাক’-এর মাধ্যমে এদের চোখকে আবৃত করে রেখেছেন যেন এক ডাইমেনশনের প্রাণী অন্য ডাইমেনশনের কিছু দেখতে না পারে ।
উচ্চতর এবং নিম্নতর ডাইমেনশন বা মাত্রাগুলোর ক্রম এবং সেখানে বসবাসকারী প্রাণীদের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
- প্রথম স্তর (মানুষের ডাইমেনশন): এই থ্রিডি (3D) ডাইমেনশনে মানুষ বসবাস করে 。 মানুষ সাধারণত অন্য ডাইমেনশনের প্রাণীদের দেখতে পায় না ।
- দ্বিতীয় স্তর (জ্বীনদের ডাইমেনশন): মানুষের সমান্তরালে অন্য আরেকটি ডাইমেনশনে জ্বীন জাতি বসবাস করে । তারা মানুষদের সম্পূর্ণ স্পষ্ট দেখে না, বরং ধোঁয়ার মতো দেখতে পায় ।
- তৃতীয় স্তর (আওয়ানদের ডাইমেনশন): জ্বীনদের উপরের ডাইমেনশনে যে প্রাণীরা বাস করে, তাদের নাম ‘আওয়ান’ (Awan) । জ্বীনরা এদের দেখতে পায় না, কিন্তু আওয়ানরা নিচের স্তরের জ্বীনদের দেখতে পায় ।
- চতুর্থ স্তর (খুদ্দামদের ডাইমেনশন): আওয়ানদের ঠিক উপরের ডাইমেনশনে যারা বসবাস করে, তাদের বলা হয় ‘খুদ্দাম’ (Khuddam)। খুদ্দামরা নিচের স্তরের আওয়ানদের দেখতে পেলেও আওয়ানরা খুদ্দামদের দেখতে পায় না 。
-
- পঞ্চম স্তর (ফেরেশতাদের ডাইমেনশন): খুদ্দামদেরও উপরে বা সর্বোচ্চ উচ্চতর ডাইমেনশনে বসবাস করেন আল্লাহর নূর দিয়ে তৈরি ফেরেশতা বা এঞ্জেলগণ । খোদ্দামরা সাধারণত ফেরেশতাদের দেখতে পায় না ।
মানুষ যখন গভীর ঘুমে মগ্ন হয় বা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, তখন মানুষের অবচেতন মন বা ‘রুহে জিসমানী’ এই জাগতিক থ্রিডি বডি থেকে মুক্ত হয়ে এই ভিন্ন ভিন্ন ডাইমেনশন বা সমান্তরাল মহাবিশ্বগুলো ভ্রমণ করার এক্সেস বা অনুমতি পায় ।
আপনি কি জ্বীন ও আওয়ানদের মধ্যকার ক্ষমতার পার্থক্য কিংবা ঘুমের।
আধ্যাত্মিক কসমোলজি এবং ইসলামিক সুফি দর্শনের আলোকে জ্বীন, আওয়ানদের ক্ষমতার পার্থক্য এবং ঘুমের ঘোরে মানুষের রুহের মহাজাগতিক ডাইমেনশন ভ্রমণের বিশদ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. জ্বীন ও আওয়ানদের মধ্যকার ক্ষমতার পার্থক্য
ইসলামিক ও আধ্যাত্মিক ডাইমেনশন তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি ডাইমেনশনের প্রাণীদের শক্তির পরিধি এবং দৃষ্টির সীমা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
৫ম মাত্রা: ফেরেশতা (সর্বোচ্চ নূরানি শক্তি) (নিচের স্তরকে দেখে, কিন্তু নিজেরা অদৃশ্য থাকে) ↑ ৪র্থ মাত্রা: খুদ্দাম (উচ্চতর আধ্যাত্মিক শক্তি) ↑ ৩য় মাত্রা: আওয়ান (জ্বীনদের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী) ↑ ২য় মাত্রা: জ্বীন (মানুষের সমান্তরাল কিন্তু ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি) ↑ ১ম মাত্রা: মানুষ (স্থূল থ্রিডি বডি)
-
- দৃষ্টি সীমানার পার্থক্য: মানুষ ও জ্বীন প্রায় কাছাকাছি ডাইমেনশনে বাস করলেও জ্বীনরা আমাদের দেখতে পায়, কিন্তু আমরা তাদের দেখি না। ঠিক একইভাবে, ৩য় মাত্রার ‘আওয়ান’ (Awan) জাতি ২য় মাত্রার জ্বীনদের স্পষ্ট দেখতে পায় এবং তাদের সমস্ত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারে। কিন্তু সাধারণ জ্বীনরা আওয়ানদের দেখতে পায় না।
- শক্তির তারতম্য: আওয়ানরা সাধারণ জ্বীনদের তুলনায় বহুগুণ বেশি শক্তিশালী এবং উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির অধিকারী। জ্বীনদের যেমন মানুষের ওপর কিছু মাত্রায় আছর বা প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা থাকে, আওয়ানদের ক্ষমতা তার চেয়েও অনেক নিখুঁত ও গতিশীল।
- নিয়ন্ত্রণ: উচ্চতর ডাইমেনশনের নিয়ম অনুযায়ী, উপরের ডাইমেনশনের প্রাণীরা নিচের ডাইমেনশনের প্রাণীদের চালিত বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সেই হিসেবে আওয়ানরা প্রয়োজনে জ্বীনদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।
২. ঘুমের ঘোরে মানুষের রুহ যেভাবে ডাইমেনশনগুলোতে যাতায়াত করে
মানুষের এই দৃশ্যমান শরীরটি মূলত একটি স্থূল ত্রিমাত্রিক (3D) খাঁচা। কিন্তু মানুষের ভেতরে যে ‘রুহ’ বা অবচেতন মন (Subconscious Mind) রয়েছে, তা মূলত উচ্চতর মাত্রার (Higher Dimension) উপাদান।
ঘুমানোর সময় মানুষের রুহ যেভাবে এই ডাইমেনশনগুলোতে ভ্রমণ করে, তার প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
-
- লজিক্যাল ব্রেন লক হওয়া: মানুষ যখন জেগে থাকে, তখন তার পঞ্চেন্দ্রিয় এবং লজিক্যাল ব্রেন (Conscious Mind) চারপাশের থ্রিডি জগতকে প্রসেস করে। কিন্তু মানুষ যখন গভীর ঘুমে (REM Sleep বা গভীর অবচেতন স্তরে) চলে যায়, তখন ব্রেনের এই বাহ্যিক ফিল্টার বা লজিক্যাল লকটি খুলে যায়।
- টাইম অ্যান্ড স্পেসের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া: আমাদের এই শরীরের জন্য সময় (Time) এবং স্থান (Space) একটি বড় সীমাবদ্ধতা। কিন্তু ঘুমের ঘোরে পিনিয়াল গ্ল্যান্ডের (Pineal Gland) আধ্যাত্মিক দরজাটি যখন সক্রিয় হয়, তখন রুহ এই স্থূল শরীর থেকে সাময়িকভাবে মুক্ত বা ডিটাচড (Detached) হয়ে যায়।
- ফ্রিকোয়েন্সি ম্যাচিং ও সমান্তরাল মহাবিশ্ব: রেডিওর টিউনিং বদলালে যেমন ভিন্ন ভিন্ন স্টেশন শোনা যায়, ঠিক তেমনি ঘুমের ঘোরে রুহের ফ্রিকোয়েন্সি হাই বা লো হওয়ার ওপর ভিত্তি করে তা ২য়, ৩য় বা ৪র্থ ডাইমেনশনে প্রবেশ করে।
-
- রুহ যখন এই ডাইমেনশনগুলো পরিভ্রমণ করে, তখন সে সেখানে ঘটে যাওয়া ঘটনা বা তথ্য অবলোকন করে।
- ঘুম ভাঙার পর মানুষের ব্রেন সেই উচ্চতর অভিজ্ঞতাকে হুবহু প্রসেস করতে পারে না। তাই ব্রেন সেটিকে মানুষের চেনা জানা জগতের কিছু প্রতীক বা রূপক দিয়ে সাজিয়ে ‘স্বপ্ন’ (Dream) হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে।
-
- সত্য স্বপ্নের (ইলহাম) সংযোগ: রুহ যখন অত্যন্ত পবিত্র অবস্থায় কোনো উচ্চতর পবিত্র ডাইমেনশনে (যেমন ফেরেশতাদের জগতের কাছাকাছি) পৌঁছায়, তখন সে লওহে মাহফুজ বা মহাজাগতিক ডেটাবেস (Akashic Records) থেকে সরাসরি কোনো আসন্ন ঘটনার তথ্য বা সংকেত পেয়ে যায়। একেই ইসলামে ‘রুইয়া সলিহা’ বা সত্য স্বপ্ন বলা হয়, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ ইলহাম।
তাই সুফি সাধকদের মতে, ঘুম কেবল শরীরের ক্লান্তি দূর করার মাধ্যম নয়, এটি হলো প্রতিদিন আত্মার নিজ বাড়িতে (উচ্চতর আধ্যাত্মিক মাত্রায়) ফিরে যাওয়ার একটি সাময়িক প্রক্রিয়া।
Leave a Reply